Skip to main content

আঁধার রাতে




আজ আবার সেই মেঘলা দিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ গোমরা হয়ে আছবেলা যতই বাড়ছে গুমোট ভাবটা আরও চেপে বসেছেবেলা গড়াবার সাথে সাথে একাকিত্তও যেন বাড়ছেকাছাকাছি কয়েকজন বন্ধুকে খবর দিতে তারাও রাজি হয়ে গেল, বিকেলে আমাদের বাড়িতে আড্ডা জমাবোসন্ধে হওয়ার আগেই একে একে পৌছে গেল পলাশ,গনেশ,ছটাই.অনিল,বিনয় আর জয়রাম
এক এক করে যখন সবাই জড়ো হয়েছি, একথা সেকথার মাঝে মনে পড়ে গেল আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের এক ঘটনা।
তখন আমি আমার গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করি।সেদিনটাও ঠিক এরকমই মেঘলা ও বৃষ্টিভরা দিন ছিল।সন্ধে বেলায় চার পাঁচজন বন্ধু মিলে আড্ডা জমাবোআমাদের আসরটা আরও জমিয়ে দিতে মা হাজির একথালা মুড়ি ও তেলেভাজা নিয়ে।আমারা দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে মুড়ি ও তেলেভাজা কাড়াকাড়ি করছি এমন সময় আমার দাদু আমাদের আসরটা দেখতে এসেছে। দাদু খুব সুন্দর গুছিয়ে গল্পো বলতে পারতো।তাই সবাই আব্দার করলাম দাদু আজ গল্পো বলতে হবে।দুই একবার বলতেই দাদু রাজি হয়ে গেল।‘গল্পো শুনবি, কি ধরনের গল্পো?’ আজ যেমন পরিবেশ আমরা সবাই একসাথে বলে উঠলাম ‘ভুতের গল্পো’।দাদু শুরু করে দিলো...
            ভুতের গল্পো কিনা জানিনা তবে যেটা বলছি একদম সত্যি ঘটনা, তারপর দাদুর গল্পো শুরু
এখন এই গ্রামে নানারকম দোকানবাজার হয়েছে চাইলে দুচারটে কাজ চালাবার মতো ওষুধবিষুধও পাওয়া যায়, কিন্তৃ আমাদের ছেলেবেলায় ছুটতে হতো সাত মাইল দূরে শহরে।
পিসিমার বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি।বেশ শক্ত সমর্থ মানুষটা কিছু দিন হলো নাগারে ভুগছেন। দুদিন হলো বাড়াবাড়ি।শহর থেকে বড় ডাক্তার ডাকা হয়েছে। অবস্থা ভালো নয়, খুব একটা ভরসা দিলেননা।বেশ কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে মোটা টাকা নিয়ে ওনার সাইকেল চেপে চলে গেলেন।সবাই খুব শঙ্কার মধ্যে চুপচাপ আছি, বাবা ভরসা দিয়ে বললেন ‘তোমরা সবাই এত ভেঙ্গে পড়লে হবে, এখনও হাল ছাড়ার সময় আসেনি,দেখাই যাক নতুন ওষুধে কাজ হয় কিনা....’আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘কিরে পারবিনা শহর থেকে ওষুধ নিয়ে আসতে?’ যদিও শীতকালের বেলা তারাতারিই নেমে এসেছে, কিছুক্ষনের মধ্যে অন্ধকার নেমে আসবে- একটা কিছু করার এই সুযোগ ছাড়তে চাইলাম না।রাজি হয়ে গেলাম তবে আমাদের বাড়ির রাখাল চরণকেও সঙ্গে রাজি করিয়ে প্রেশক্রিপশন ও টাকাপয়সা নিয়ে তৈরি হয়ে রওনা দিলাম।  
গ্রামের সীমানা যখন পেরচ্ছি সূর্য তখন ডুবে গেলেও ততটা অন্ধকার হয়নি, চরনকে তারাতারি পা চালাতে বললাম।সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা মা্‌ঠ, শীতের বেলা মাঠের চাষীরা মাঠ ছেড়ে ফিরে এসেছে, রাখালরা গরু নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।এখন মাঠ একদম ফাঁকা। খানিক্ষন যাওয়ার পরেই মনে হলো ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেলো। এমন অন্ধকার বিশ পচিশ ফুট দুরে আর কিছু ঠাওর হয়না। দূর থেকে কোন গ্রামের কারও বাড়ি থেকে ভেসে আসা জোনাকির মতো টিমটিমে আলো জীবনের অস্তিত্ত্ব জানান দিলেও আমাদের গা ছমছম করা এক অদ্ভুত পরিস্থিতি মনে হচ্ছে।এইভাবে দুজনে হনহন করে মাঠের আলের উপর এবড়ো খেবড়ো পথ দিয়ে হেঁটে চলেছি।অনেক্ষন পর নিরবতা ভঙ্গ করে আমিই চরনকে বললাম ‘কিরে চুপচাপ আছিসযে, ভয় করছেনাতো!’ ধরাধরা গলায় আমায় অভয় দিয়ে উত্তর দিলো ‘না না ভয় কিসের, তবে কি ভীষণ অন্ধকার নিজেদেরকেও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিনা। পাশ দিয় কেও চলে গেলেও বুঝতে পারবোনা।‘ এই কথা বলতে বলতে পকেট থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা আমায় ও আর একটা নিজে ঠোটে নিয় দেশলাই ধরালো। আমি বেশ বুঝতে পারছি নিজেদের মনে সাহস বাড়ানোর জন্যই এই ব্যবস্থা। বিড়ির আগুনে জমাট অন্ধকারের মধ্যে আমাদের মুখগুলো মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে।একবার আমি জানতে চাইলাম “‘যা ভীষণ অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছেনা আমরা ঠিকপথ দিয়ে যাচ্ছিতো?” চরণ ভরসা দিয়ে জানলো “না না ভূল কেন হবে, এতোদিনের চেনা রাস্তা-এইতো আর খানিকটা এগিয়ে গেলেই মাঠ শেষ হবে তারপর চামটি বাগান”।
চামটি বাগান কথাটা শোনার সাথে সাথে বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠলো।চামটি বাগান হলো প্রায় মাইল তিনেক বিস্তৃত ঘন জঙ্গল, সেরকম জন্তু জানোয়ার না থাকলেও সাপখো্‌প, শেয়াল, বাদুড়ের উপস্থিতিতো আছেই। তবে তার চাইতেও তেনাদর উপস্থিতির কথা এড়িয়ে দিতে পারলামনা।জঙ্গল পাড় করলেই নদী, রেল ব্রিজ তার নিচেই শ্মশান! ঐ অঞ্চলের সমস্ত শব দাহের একমাত্র জায়গা ঐটাই। “কিরে চরণ এই ঘন অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে এতোটা রাস্তা পার করবো কি করে, যতো এগোচ্ছি কি রকম যেনো মনে হচ্ছে” আচমকা দূর থেকে ঝটপট আওয়াজ ভেসে এলো আর তার সাথে বাচ্চা ছেলের কান্নার শব্দ……একটু থমকে গিয়ে চরণের কাঁধে হাত রাখার চেষ্টা করাতে ও কিছুটা সাহস দিয়ে বললোঘাবরে যেওনা, এটাতো শকুনির ডাক, মনে হচ্ছে জঙ্গলের কাছে এসে গেছি এবার আমাদের সাবধানে চলতে হবেগভীর জঙ্গল বড়ো বড়ো গাছ তার নিচে ঝোপঝাড় কাটিয়ে এগোচ্ছি‌, হঠাৎ দ্রুত গতিতে কিছু একটা চলে গেলো, অন্ধকারের মধ্যেও বুঝতে পারলাম ওটা শেয়াল আমাদের উপস্থিতি জানতে পেরে দৌড় দিয়েছে।
এই ভাবে দু হাতের মুঠো শক্ত করে দুরদুর বুকে দুজনায় এগিয়ে যাচ্ছি।হঠাৎই সামনে মিটমিট করা দুটো অলো দেখতে পেলাম যেনো অলৌকিক কোনো কিছুর দুটো চোখ, আর তার সাথে সোঁ সোঁ করা হাল্কা আওয়াজ প্রথমে বিশেষ গুরুত্ত্ব না দিয়ে এগিয়ে চললাম কিন্তূ যতো এগোচ্ছি ঐ চোখ দুটো আরও বড়ো হয়ে আরও প্রকট হয়ে দুলতে দুলতে একবার আমার দিকে এগিয়ে আসছে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে আর ঐ সোঁ সোঁ করা হাল্কা আওয়াজ আরও বাড়তে বাড়তে অট্টহাসির মতো শোনাচ্ছে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি অলৌকিক ঐ চোখ দুটো হা হা করে হাসতে হাসতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। চাইলেও আর এক পা এগোতে পারছিনা, পা থেক মাথা অব্দি ক্রমশ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, আগে পিছে আর কিছুই চিন্তা করতে পারছিনা। তারপর শরীর একদম অসাড় হয়ে নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ঝোপের মধ্যেই পরে গেলাম।
কতক্ষন এইভাবে পরে ছিলাম জানিনা, আস্তে আস্তে চোখ খুলতে দেখি হারিকেন ও টর্চ হাতে বেশ কয়েকজন লোক আমাকে ঘিরে রেখেছে আর চরন আমার চোখেমুখে জলের ছিটে দিচ্ছে।সবাই কৌতহলের সঙ্গে জানতে চাইছে কিভাবে কেনো এই অবস্থা হলো। এরপর চরনই জানালো হঠাৎই গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে আমার জ্ঞান হারাতেই ও খুব ভয় পেয়ে গেছিলো, বেশ খানিক্ষন অপেক্ষা করেও কোনো উপায় না দেখে কাছাকাছি গ্রামে গিয়ে এই লোকজন জড়ো করতে পেরেছে।যাইহোক ঠাকুরের কৃপায় মারত্মক কিছু হয়নি।
ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে জড়ো হওয়া মানুষগুলো সব চলে গেলো। একটু স্বাভাবিক হতেই দেখে বুঝতে পারলাম ঠিক সামনের ঝোপটায় বিশাল মাকড়সার জাল তার ওপরে বড়ো বড়ো শিশিরের ফোটা তখনো আটকে রয়েছে।দুর থেকে চলে যাওয়া ট্রেনের আলোর ছটায় ঐ শিশিরের ফোঁটাগুলো জলজল করে উঠেছিলো। হাওয়ায় দুলতে দুলতে সেটাই আগেপিছে হচ্ছিলো।আর হা হা শব্দে অট্টহাসি ওটা নিছকই মনের ভুল।  

Comments

Popular posts from this blog

আমার ছড়া

      ।। সধবার একাদশী ।।                                    কাবলিওয়ালার ব‌উ দেখিনি পাঞ্জাবীদের টাক দেখিনি বোরখা পরে তোলা সেলফি দেখিনি নাঙ্গা বাবার  কাপড়জামা দেখিনি। গুজরাটেতে মদ চলেনা অরুনাচলে মদের নিষেধ চলেনা নৈনীতালে ফ‍্যান চলেনা লে লাদাকে রেল চলেনা। আইসক্রীমে বরফ নেই শ‍্যাওড়া গাছে পেত্নী নেই কৃষ্ণনগরে কৃষ্ণ নেই আজ লাইফ আছে জীবন নেই।                      ।। রসগোল্লা ।।                             পান্তোয়া সন্দেশ যতকিছু আনোনা বাংলার রসগোল্লা তার নেই তুলনা। নানাভাবে তোলপাড় কতকিছু ঝামেলা নবীনের নব আবিষ্কার নাম রসগোল্লা। আসল ছানার গোল্লা সে...

বাঁকুড়ার টেরাকোটা

                                                                বাঁকুড়ার টেরাকোটা পশ্চিমবঙ্গ তথা  ভারতের শিল্পকর্মের এক বিশেষ স্থান   অধিকার করে আছে।  বাঁকুড়ার  পোড়ামাটির  ঘোড়া ও হাতি নির্মাণের  প্রধান শিল্প  কেন্দ্র গুলি   হল পাঁচমুড়া,  রাজাগ্রাম, সোনামুখী ও হামিরপুর।  প্রত্যেক শিল্পকেন্দ্রের নিজস্ব স্থানীয় ধাঁচ ও  শৈলী রয়েছে। এগুলির মধ্যে পাঁচমুড়ার  ঘোড়াগুলিকে চারটি ধাঁচের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম  বলে মনে করা হয়। বাঁকুড়ার ঘোড়া এক  ধরনের পোড়ামাটির ঘোড়া। ঘোড়া ছাড়াও বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী উট , হাতি , গনেশ ,  নানা ভঙ্গিমায় নৃত্যরত মূর্তি তৈরী করে  টেরাকোটা আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।  রাঢ় অঞ্চলে স্থানীয় লৌকিক দেবতা ধর্মঠাকুরের পূজায় টেরাকোটা ও কাঠের ঘোড়া ব্যবহৃত হয়। অনেক গ্রামে বিভিন্ন দেবদেবীর কাছে গ্রামবাসীরা ঘোড়া মা...

মহালয়া কি এবং কেন

### মহালয়া কি এবং কেন ### আত্মা অবিনশ্বর অর্থাৎ আত্মার মৃত্যু নেই, এই তত্বের ওপর ভিত্তি করেই হিন্দুধর্ম এতযুগ ধরে তার গতি বজায় রেখেছে। পুর াণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান। এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে; এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। হিন্দু মহাকাব্য অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দে...